✍️ শ্রী সুদীপ্ত পাত্র
বর্তমানে সংস্কৃত ভাষায় কেউ কথা বলে না, তাহলে সংস্কৃতকে মৃত ভাষা বললে আপত্তি কোথায়? সে প্রশ্নটার উত্তর পরে দিচ্ছি, আগে বলি একশ্রেণির মানুষের সংস্কৃতকে মৃত ভাষা বলার পেছনের উদ্দেশ্যটা কী?
সব ভাষা কি কেবল কথা বলার জন্যই ব্যবহার হয়? ভারতবর্ষের সংস্কৃত ভাষার কি ব্যবহার হয় না? গোটা বিশ্বে বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে যখন সংস্কৃত ভাষা চর্চার সক্রিয় কেন্দ্র আছে তখন ভারতে সংস্কৃত একটি মৃত ভাষা " ঘোষণার উদ্দেশ্য কি?একটি সমাজের বিভিন্ন প্রয়াস ও প্রচেষ্টাকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার উদ্ভব ঘটে। ভাষাকে শুধুমাত্র কথা বলার মাধ্যম হিসেবে ধরে নেওয়াটা একটা বিভ্রান্তি। সমাজের নানা প্রকার প্রয়াসকে ঘিরে নির্দিষ্ট ভাষার উদ্ভব হয়। যেমন—রসায়নশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, যোগশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আইনশাস্ত্র—প্রত্যেকটির জন্য নির্দিষ্ট ভাষা বা পরিভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। রসায়নশাস্ত্রে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো সাধারণ মানুষের না জানলেও চলে, তবে সেগুলোকে পুরোপুরি অচল করে দিলে রসায়নশাস্ত্রই একসময় বিলীন হয়ে পড়বে। তার নির্দিষ্ট পারিভাষিক শব্দগুলো ব্যবহার না করে রসায়নশাস্ত্রকে ব্যাখ্যা, অনুশীলন বা তার চর্চা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
সাধারণ মানুষের জীবনে সংস্কৃত ভাষার কোন দৈনন্দিন প্রয়োগ নেই অন্ততঃ কথোপকথনের ক্ষেত্রে, তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে সংস্কৃত ভাষার বিরোধিতার ভেতরের কূট উদ্দেশ্য বোঝা সম্ভব নয়। একটি ভাষার ব্যবহার শুধু তার কথোপকথনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।একটি ভাষাকে অচল করার মাধ্যমে সেই ভাষার সঙ্গে যুক্ত জ্ঞানপ্রক্রিয়া ও শাস্ত্রটিকেও অচল করা সম্ভব। সংস্কৃত ভাষা কথোপকথনের জন্য ব্যবহার হয় না ঠিকই, কিন্তু সনাতন সমাজে এমন কোনো পরিবার নেই যেখানে পূজা-পাঠ, অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে তার নিয়মিত ব্যবহার নেই। পরমাণু অধ্যয়নের জন্য যেমন একটি নির্দিষ্ট ভাষা ও শৈলী তৈরি হয়েছে, তেমনি পরমাত্মা অধ্যয়নের জন্য যে ভাষা ও শৈলী রয়েছে তাকেই আমরা সংস্কৃত ভাষা বলি। সংস্কৃত ভাষা মানুষের চলতি বা কথ্য ভাষা কোনোদিনই ছিল না। যদিও ওই ভাষায় কথা বলা সম্ভব, তবে শুধু কথা বলার জন্য ওই ভাষা নির্মিত নয়। ঠিক যেমন বিজ্ঞানের নানা শাখার শব্দবিন্যাস ও প্রয়োগশৈলী ভিন্ন এবং তা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক কথাবার্তায় বিশেষ প্রয়োজন পড়ে না।
তবে সাধারণ মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল ভোগের জন্য তার অভ্যন্তরীণ টেকনিক্যাল ভাষা জানার প্রয়োজন হয় না। যেমন—মোবাইল ব্যবহারের জন্য মোবাইল কীভাবে নির্মিত হয়, তার সূত্র ও বিজ্ঞান সাধারণ মানুষের জানার প্রয়োজন পড়ে না।
অনুরূপভাবে, সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে ব্যাকরণগত জ্ঞান না থাকলেও সাধারণ মানুষ তার ফল লাভ করতে পারে। মন্ত্র, তন্ত্র, যন্ত্র ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের মন ও পরিবেশকে সংস্কৃতের জ্ঞানলব্ধ প্রযুক্তি দ্বারা একটি নির্দিষ্ট ইতিবাচক মাত্রা দেওয়া যায়। কিন্তু সেই সাধারণ সনাতন সমাজের কাছে যখন সংস্কৃত ভাষাকে মৃত বলা হয়, তখন তারা এর পেছনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। সংস্কৃত জ্ঞান ও ভাষা চর্চা থেকে উদ্ভূত যে জীবন-প্রযুক্তি তারা নিত্যদিন জীবনে ব্যবহার করে আসছে, তা থেকে তাদেরকে বিচ্যুত করাই ওই স্লোগানের আসল উদ্দেশ্য।
‘সংস্কৃত’ শব্দটির মধ্যেই এর অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে আছে—যা পরিশোধিত, পরিশীলিত ও সংস্কারপ্রাপ্ত। অর্থাৎ সনাতনী সমাজের জীবনধারা ও মূল্যবোধকে পরিচালিত, পরিশীলিত ও দিশা দেওয়ার প্রযুক্তি এবং নানান রীতিনীতি এই সংস্কৃত ভাষা বা সেই ভাষার জ্ঞানচর্চা থেকেই উদ্ভূত।
ভারতীয় দর্শনে অপৌরুষেয় জ্ঞানের শাস্ত্রগুলোকে ‘শ্রুতি’ বলা হয়। এর গভীর ও বহুস্তরীয় অর্থ রয়েছে। যার অন্যতম অর্থ হলো—এখানে নির্দিষ্ট ভাবটিকে ব্যক্ত করার জন্য কোনো স্থূল অনুবাদ বা ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে সেই চেতনা সঞ্চার করা সম্ভব নয়। যেমন সঙ্গীত; শব্দের বাহ্যিক অর্থ বিশ্লেষণ করে সঙ্গীতের যে ভাব ও রস, তা উপলব্ধি করানো সম্ভব নয়। নৃত্যের ক্ষেত্রেও তাই। সংস্কৃতে এমন বহু শব্দ ও উচ্চারণ রয়েছে যার যথাযথ অনুবাদ সম্ভব নয়। এজন্য রাজীব মালহোত্রা তাঁর Sanskrit Non-Translatables গ্রন্থে এরকম বহু সংস্কৃত শব্দের উদাহরণ দিয়েছেন, যার কোনো যথার্থ অনুবাদ অন্য ভাষায় সম্ভবই নয়।
সুতরাং, সংস্কৃতকে মৃত ভাষা বলে ঘোষণা করার যে দাবি ওঠে, তা আসলে একটি গোটা সভ্যতার মূল্যবোধকে মৃত ঘোষণার পরোয়ানা। একটি প্রাচীন সভ্যতার জ্ঞানচর্চা ও তার জীবনধারাকে বাতিল করার অপচেষ্টা। একটি সভ্যতা মনুষ্যত্বকে যে আত্মিক উচ্চতা দিতে চেয়েছিল, তার সেই প্রয়াসকে অস্বীকার করার ষড়যন্ত্র। তাই সংস্কৃত ভাষাকে মৃত ঘোষণা করার দাবি একটি সভ্যতাকে মৃত ঘোষণা করার দাবিরই সমান।


